-'বাবু দরজাটা খুল, বলছি? তোর যে চণ্ডাল রাগ!মেয়েটা ভয়েই মরে যাবে তো, বাবু?
-'এই তুমি হা করে কী দেখছ? জলদি
বড় খোকাকে ফোন দাও? দরজা ভাঙার ব্যবস্থা করো?আমার খুব ভয় করছে, বাবুর বাবা।যে উন্মাদ ছেলে তোমার।
-"আহ্ রেণু এত অস্থির হইয়ো না তো। তোমার প্রেশার বেড়ে যাবে। আমি দেখছি, কী করা যায়।
বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে প্রচণ্ড চিৎকার, চেঁচামেচি, ভাঙাচোরার আওয়াজ ভেসে আসছে! মিজানুর আহমেদ তার স্ত্রী রেণুকে সরিয়ে দিয়ে, দরজায় কড়া নাড়ল। রাগী অথচ ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলল,
-"ঈশান দরজাটা খুলো বলছি? এটা কোন বস্তি নয়।আর তুমিও কোন বস্তির ছেলেপেলে নও, যে রাত-বি'রাতে এভাবে বউয়ের সাথে ঝগড়াঝাটি, মারামারি করবে? ঝগড়া করতে হলে, এই মুহূর্তে আমার বাসা থেকে বেড়িয়ে যাও। রাস্তায় গিয়ে যত খুশি ঝগড়া করো।
-"আহ্, বাবুর বাবা, কী শুরু করলে তুমি?
ভেতর থেকে আচমকা হুট করে দরজা খুলে গেল।ঈশান তীব্র দৃষ্টিতে বাপের দিকে এক পলক তাকাল।তারপর রাতদুপুরে এলোমেলো পায়ে, বাসা থেকে বেরিয়ে গেল। রেণু তাড়াহুড়ো করে ঈশানের ঘরে ঢুকল। সারা ঘরে কাঁচের টুকরো সহ ভাঙা জিনিসপত্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বিছানায় উপুড় হয়ে, শুয়ে শুয়ে হাপুস নয়নে কাঁদছে কণা। কোমড় পর্যন্ত সুন্দর ঢেউ খেলানো চুলগুলো ফ্লোর ছুঁই ছুঁই। রেণু , কণাকে বিছানা থেকে টেনে তুলল। এলোমেলো চুলগুলো হাত খোঁপা করে দিল। তারপর পরম যত্নে চোখের জলটুকু মুছিয়ে দিয়ে, বুকে টেনে নিল। কণাকে স্বাভাবিক হওয়ার সময় দিয়ে, ধীরে ধীরে প্রশ্ন করল,
-'কী হয়েছে মেঝবউ? হঠাৎ বাবু এত ক্ষেপল কেন?
কণা মাথা নীচু করে ফেলল। কিইবা বলার আছে!
ঘটনার শুরু আজ সকাল বেলা। শাশুড়ী আর ননদের জোড়াজুড়িতে পরিক্ষা দিতে রাজি হয়েছে কণা। আজ ফর্ম ফিলাপের শেষ দিন ছিল। ঈশান ফোনে পইপই করে বলে দিয়েছে, অদিতি অথবা বড় ভাবীকে সাথে নিয়ে যেতে। কিন্তু কলেজ খুব বেশি দূরে না দেখে, কণা একা গিয়েছিল। আর দূর্ভাগ্যক্রমে কণার পুরোনো প্রেমিক ঋকের সাথে দেখা হয়ে যায়। যেহেতু ঈশানের সাথে কণার অ'মতে বিয়ে হয়েছে। ঋক সেই সুযোগ নিয়ে অনেক ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে কণাকে।ঘটনার এক পর্যায়ে আচমকা কণার হাতদুটোও চেপে ধরে ঋক। সে বেশি কিছু চায় না। শুধু ঈশান সপ্তাহে যে চারদিন বাসায় থাকে না। সেই দিন গুলোতে যেন, কণা ঋকের সাথে আগের মতো রাত জেগে ফোনে কথা বলে। কণা কিছুতেই রাজি হয় না। ঈশানের সাথে যেভাবেই হোক। বিয়ে তো হয়ে গেছে। এখন পরকীয়া করে, কিছুতেই ঈশানকে ঠকাতে পারবে না কণা।তারচেয়ে বরং জীবন যেভাবে চলছে, চলুক!
ঋক ঠিক ঠিক জানত। ঋকের প্রস্তাবে কণা কিছুতেই রাজি হবে না। তাই তো খুব কৌশলে, কণার অগোচরে, পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঋকের সাথে কণার ক্লোজ, হাত ধরাধরি করা বেশকিছু ঘনিষ্ঠ ছবি তুলেছে ঋকের বন্ধু। কণা চলে যেতেই ঋক জিহ্বা দিয়ে শুকনো ঠোঁট দুটো ভিজিয়ে নিয়ে পৈশাচিক হাসি দিল। বলল,
-'তোমাকে আমি অন্যকারো সাথে সুখী হতে দেব না কণা। তুমি আমার রাতের ঘুম হারাম করেছ। আমি তোমার সারাজীবনের সুখের ঘুম হারাম করব। মাইন্ড ইট..
ছবিগুলো ফেইক আইডি দিয়ে ঈশানের মেসেঞ্জারে সেন্ট করে দিল ঋক।
ঈশান একটা সরকারি ব্যাংকে, সিনিয়র অফিসার পদে চাকরি করে। ঈশান ছিল বুয়েটের মেধাবী ছাত্র। কোন ঘুষটুষ না। ছাত্র জীবনে একদম নিজ যোগ্যতায় ব্যাংকের চাকুরীটা পেয়েছে ঈশান। যদিও ঢাকা থেকে অনেকদূর। একদম উপজেলা পর্যায়ে ব্যাংকের নতুন শাখা খুলেছে। সেখানেই ঈশান বছর খানিক যাবৎ কর্মরত আছে। এমনিতেই সোনালী ব্যাংকে সবসময় ভীড় লেগে থাকে। শুক্র, শনি দু'দিন বন্ধ দেখে, আজ যেন একটু বেশিই ভীড়। এত কাজের চাপ! রীতিমতো চোখে মুখে অন্ধকার দেখছে ঈশান। সারাদিন ফোন হাতে নেওয়ার ফুরসত পায়নি। অফিস ছুটির পর! কণাকে একবার ফোন করার তাগিদ অনুভব করল ঈশান।
আজ থেকে ছয়মাস আগে, একদম হুট করেই কণার সাথে বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের আগে কণার প্রেমঘটিত ব্যপার ছিল। মেয়েটা নিজের বিয়ে ভাঙার জন্য ঈশানের অফিসেও এসেছিল বৈকি! ততক্ষণে দেখতে ছোটখাটো, একটু হেলদি, গালের ভাঁজে টোল পরা, সারাক্ষণ ঠোঁটের কোণে হাসি লেগে থাকা মিষ্টি মেয়েটার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল ঈশান। এই পুতুল পুতুল,পিচ্চি মেয়েটার সাথে বিয়ে হবে না। ভাবলেই কেমন দমবন্ধ অনুভূতি হচ্ছিল। পরে অবশ্য খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারে, কণার যার সাথে প্রেম। ছেলেটা বেশি সুবিধার না। পাড়ার বখাটে। তাই ঈশান আর বিয়েতে মানা করেনি। যদিও আজও কণার মন পায়নি ঈশান।
এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই ফোনের ডাটা অন করে, মেসেঞ্জারে ঢুকতেই দেখল। একটা অচেনা আইডি থেকে কণার সাথে একটা ছেলের বেশকিছু অন্তঃরঙ্গ ছবি। ছবিগুলো দেখে ঈশানের পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেল। এই ছেলেটা সহজে রাগে না। কিন্তু রাগলে একদম হিংস্র, জানোয়ার হয়ে যায়। কীভাবে কীভাবে যে বাড়ি এসেছে। ও নিজেও জানে না।
কণা, শাশুড়ীর সাথে রান্না ঘরে ছিল। ঈশান রাতে বাসায় এসে, ব্যাগটা সোফায় ছুড়ে ফেলল। তারপর কারো সাথে কোন কথা না বলে, আচমকা কণার একহাত মুঠোয় পুরে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে গেল। ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দিয়ে, রাগে কাঁপতে কাঁপতে কণার দু'হাত পেছন থেকে মুচড়ে ধরল। বলল,
-"বলো, কলেজের নাম করে, দিন দুপুরে কার সাথে ফষ্টিনষ্টি করতে গেছিলা? তোমার কোন মান-সম্মান না থাকতে পারে। কিন্তু এই এলাকায় আমার সম্মান আছে। আমার বাপ, ভাইয়ের সম্মান আছে। বিয়ের আগে, তোমার প্রেমিকের সাথে যা খুশি করছ। কিন্তু এখন! এসব নষ্টামি আমি একদম সহ্য করব না কণা।এই তুমি চুপ করে আছ কেন? কথা বলো?
কণা, ঈশানের রক্তলাল চোখ দেখে ভয় পেল। তবুও দমে গেল না। জেদী কণ্ঠে বলল,
-'কী করেছি আমি?
কণার হেয়ালি প্রশ্নে, ঈশান নিজের বাস্তব জ্ঞানবৃদ্ধি হারাল। কণাকে ছেড়ে দিয়ে, হাতের কাছে যা পেল সব ভাঙল। কণা ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল। ঈশান আবারও কণার ঘাড় চেপে ধরে, ফোনের গ্যালারী থেকে ছবিগুলো বের করে। একে একে কণাকে দেখাল।
আতঙ্কে কণার মুখের রক্ত সরে গেল। হায়, এতবড় সর্বনাশ কে করল কণার? ঈশান একরোখা, সন্দেহপ্রবণ ছেলে। একবার যা ও সত্যি মনে করে। তা হাজার বলে কয়েও মিথ্যা প্রমাণ করা যায় না। কখনো ঈশানের যুক্তিতর্কের সাথে পেড়েও উঠে না কণা। তাই ঈশানকে সত্যি মিথ্যা বোঝানোর ব্যর্থ চেষ্টা না করে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। ঈশান বলল,
-'আমি এক্ষুণি তোমার বাবাকে ফোন করে সব বলব।এভাবে সংসার হয় না।
কণা দু'হাতে মুখ ঢেকে ঝরঝর করে কেঁদে দিল।বিড়বিড় করে বলল,
-'প্লিজ না, আপনার যা শাস্তি দেওয়ার আমাকে দিন?আমার বাবাকে এই নিয়ে কিছু বলবেন না। মানুষটার অলরেডি দু'বার স্ট্রোক হয়েছে। এবার আর বাঁচানো যাবে না।
ঈশান ধপ করে, মাথা চেপে ধরে, মেঝেতে বসে পরল।গালে হাত রেখে খানিক কী যেন ভাবল! কণার দিকেও করুণ দৃষ্টিতে একপলক তাকাল। কী মায়াবী চেহারা মেয়েটার। এই মেয়েটা সব সময় কলকলিয়ে হাসলেই তো বেশি ভাল লাগে, শান্তি লাগে। নিজের ইমোশনকে পাত্তা দিল না ঈশান। অস্থির কণ্ঠে বলল,
-'তুমি আমায় কথা দিয়েছিলে কণা। তুমি বিয়ের পর, ছেলেটার সাথে আর কোন সম্পর্ক রাখবে না। তার বিনিময়ে আমার কাছে সময় চেয়েছিলে। আমি আমার কথা রেখেছি। সবার সামনে স্বামী-স্ত্রী'র মতো চলাফেরা করলেও এই বন্ধ ঘরে। আমরা দু'জন দুই মেরুর বাসিন্দা। স্বামী হিসাবে তোমার কাছে আমারও কিছু চাওয়া পাওয়া, দাবি আছে। আজ পর্যন্ত স্বামীর অধিকার নিয়ে কখনো তোমার সামনে দাঁড়িয়েছি?তুমিই বলো? তবে তুমি কেন আমার কথা রাখতে পারলে না কণা?
কণা বলার চেষ্টা করল,
-'আমিও কথা রেখেছি।
-'তাহলে এই ছবিগুলো কী আকাশ থেকে পড়ল?ড্যামেট..
কণা আঁৎকে উঠল। ঈশান আবারও বলল,
-"আমি মেনে নিলাম। তোমার কোনো দোষ নেই। তাহলে এই ছেলেটা তোমার হাত ধরে কোন সাহসে? তুমি অনুমতি না দিলে তোমার গা ঘেঁষে দাঁড়ায় কিংবা কাঁধে হাত রাখে কীভাবে? ছবিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, তুমি এই লুজারটার সাথে হেসে হেসে কথা বলছ। কণা আমি জোর করে, স্বামীর অধিকার ফলাই না বলে এই না!তোমার সাথে যে যা খুশি করবে, আর আমি চেয়ে চেয়ে দেখব। আমার ধৈর্যের পরিক্ষা নিও না কণা। এর ফল কিন্তু খুব খারাপ হবে। কণা অস্থির হয়। বলে,
-'বিশ্বাস করুণ? আপনি যা ভাবছেন, সে'রকম কিছুই হয়নি।
ঈশান তাচ্ছিল্য করে হাসে। চিৎকার করে বলে,
-"আমার ভাবা না ভাবায়, কী এসে যায় তোমার? তুমি তো গায়ে বিবাহিত ট্যাগ লাগিয়ে, দিন দুপুরে ঠিকই নোংরামি করে বেড়াচ্ছ।
-'এত কি ভাবছ মেঝবউ?
কণার দু'চোখ জলে থৈ থৈ। শাশুড়ীর প্রশ্নে মৃদু হাসল।আসলে এই মেয়েটা হাসি ছাড়া বেশিক্ষণ থাকতেই পারে না। যত কিছুই হয়ে যাক না কেন! সব সময় ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি লেগেই থাকে। রেণু দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই পুতুল পুতুল, আদুরে মেয়েটার সাথে ঈশান কেন যে এতো ঝগড়া করে। তা ভেবেই পায় না রেণু।ঈশানটা ছোটবেলা থেকেই একগুঁয়ে, জেদী আর প্রচণ্ড রাগী। ভাল ছাত্র দেখে, কখনো সেভাবে ঈশানকে শাষণ করা হয়নি। কিন্তু আগে এতো হুটহাট রেগে যেত না।
কণা সে'কথায় উওর দিল না। শুকনো মুখে বলল,
-'মা অনেক রাত হয়েছে। এত রাতে 'ও' কোথায় গেল, বলুন তো?
রেণুকেও চিন্তিত দেখাল। ছেলেটা দিন দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। কিছু বলাও যায় না। ছ্যাঁত করে উঠে।
তখন ঈশান এত জোরে কণার ঘাড় চেপে ধরেছে। ঘাড় ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। ব্যথায় টনটন করছে। রেণু আঁৎকে উঠল। অদিতিকে ডেকে বরফ আনতে বলল।
-"ইশ্.. অপদার্থটা তোমার ঘাড়ের কী অবস্থা করেছে।এই অদিতি? শিগগিরই আয় না?
অদিতি একটু ছাদে গিয়েছিল। শুভদার সাথে ফোনে কথা বলতে। এরমধ্যে এত কাণ্ড ঘটে গেল? অদিতি মা'র হাতে বরফের বাটি দিয়ে, পুরো ঘর পরিষ্কার করল। তারপর কণার পাশে বসে আলতো হাতে ঘাড় মালিশ করে দিল। রেণু বলল,
-"অনেক রাত হয়েছে। ঈশানকে ফোন করা দরকার।অদিতি, তুই বরং রাতটা কণার সাথেই থাক। অদিতি মাথা নেড়ে সায় দিল। মা চলে যেতেই অদিতি দুষ্টু হেসে বলল,
-'আহারে আমার ভাইটা! বউকে তো আর মন ভরে আদর করতে পারে না। তাই মেরেই শোধ তুলে।
এই তোদের সমস্যাটা কী বলত, কণা?
কণা আগুন চোখে তাকায়। কটমট করে বলে,
-''তোর ভাই আস্ত একটা জংলী ভূত। এত জোরে আমার ঘাড় চেপে ধরেছে! আর একটু হলেই জানটা বেড়িয়ে যেত। বাট্টু নিজে খারাপ। আবার আমাকে বলে, আমি না কী নোংরামি করে বেড়াই। ছিঃ..
-"রোজ রোজ এত ঝগড়া না করে। ভাইয়াকে মনের কথা বলে দিলেই তো পারিস কণা?
-"জীবনেও বলব না।
অদিতি বেখেয়ালে বলে,
-'তোর ব্যবহারে ভাইয়া অনেক কষ্ট পায় রে। ও তোদের দূরত্বটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। তাই সামান্য কারণেও তোর সাথে বাজে ব্যবহার করে ফেলে। আজ আবার কী হয়েছিল রে?
(চলবে)
(রিপোস্ট)
প্রিয়_প্রাক্তন
লেখা_Bobita_Ray
পর্ব-১
(আপাতত নতুন কিছু লেখা সম্ভব না। এই গল্পটা পড়ুন। যদি ভাল রেসপন্স পাই। তাহলে পুরোটাই আবারও ফেসবুকে দেওয়া হবে। সবাই লাইক, কমেন্ট করে জানাবেন। কেমন লাগল।)

